September 20, 2026, 10:15 am
শিরোনাম :
আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী বাংলাদেশি হাফেজ নুরুদ্দিন জাকারিয়াকে সংবর্ধনা দিয়েছে মক্কা সুইস আল খলিল কোম্পানি আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান বাংলাদেশের হাফেজ নুরুদ্দীন জাকারিয়া । সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মক্কায় খাবার বিতরণ ওমরাহ ভিসা নিয়ে নতুন শর্ত দিল সৌদিআরব ১৯ দিনব্যাপী ৫৬তম আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত সৌদিআরবে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশির মৃত্যু লোহাগাড়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় প্রবাসী কমিউনিটি লিডার আব্দুস সামাদ আজাদ সৌদিআরবে অগ্নিকাণ্ডে সাতকানিয়ার ইলিয়াসের মৃত্যু চট্টগ্রামের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক বিদ্রোহী: মুহাম্মদ রজব আলী খাঁ আজ রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে বৈঠক ডেকেছেন তারেক রহমান

চট্টগ্রামের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক বিদ্রোহী: মুহাম্মদ রজব আলী খাঁ

Reporter Name

চট্টগ্রাম তখন ব্রিটিশ ভারতের সামরিক গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। পাহাড়তলী সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩৪তম পদাতিক বাহিনীতে ছিলেন এক হাবিলদার—রজব আলী। সৈনিক জীবনে তিনি ছিলেন ৪ নম্বর কোম্পানির একজন অভিজ্ঞ নন-কমিশন্ড অফিসার। ক্যাপ্টেন পি এইচ কে ডিউলের অধীনে তিনি দায়িত্ব পালন করতেন সেই সেনানিবাসেই, যেখানে প্রতিদিন শৃঙ্খলা আর নিয়ন্ত্রণই ছিল জীবনের নিয়ম।

তবে ১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে সেই শৃঙ্খলার ভেতরেই ভাঙনের শব্দ শোনা যায়।

১২ নভেম্বর ১৮৫৭ সালে চট্টগ্রামে ৩৪তম বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ৪০০ সৈনিক বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ব্যারাকপুর থেকে আগত একটি সিপাহি দলও এই বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিদ্রোহীরা অস্ত্রাগার ও ট্রেজারিতে হামলা চালিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং রসদ সংগ্রহ করে। ওই সংঘাতে কিছু ব্রিটিশ অফিসার হতাহত হন, আর আতঙ্কিত ব্রিটিশ সৈন্যরা সমুদ্রপথে জাহাজে আশ্রয় নেয়। প্রায় ৩০ ঘণ্টা চট্টগ্রাম কার্যত ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়ে পড়ে।

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্বের ভার ধীরে ধীরে এসে পড়ে হাবিলদার রজব আলীর ওপর। সিপাহী জামাল খানসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ২, ৩ ও ৪ নম্বর কোম্পানির বিদ্রোহী দলকে সংগঠিত করেন। পরিকল্পনা ছিল, অস্ত্র ও রসদ নিয়ে নিরাপদ অঞ্চলের দিকে সরে যাওয়া।

বিদ্রোহীরা চট্টগ্রাম ত্যাগ করে ফেনী নদী পার হয়ে ত্রিপুরা সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। উদ্দেশ্য ছিল ত্রিপুরার নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। চট্টগ্রামের কমিশনার ত্রিপুরার রাজাকে সতর্ক করে দেন, এবং ত্রিপুরা রাজ্য ব্রিটিশদের সঙ্গে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহীদের প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়।

২ ডিসেম্বর ১৮৫৭ সালের দিকে বিদ্রোহীরা সীতাকুণ্ড হয়ে ত্রিপুরার প্রবেশদ্বারে পৌঁছায়। সেখানে তারা দেখতে পায় আগে থেকেই প্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনী তাদের অপেক্ষায় আছে। বাধ্য হয়ে তারা কুমিল্লার পাহাড়ি পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকে।

কিন্তু ত্রিপুরা বাহিনী তাদের পিছু নেয়। ধীরে ধীরে বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ অবস্থায় পাহাড়ি অঞ্চল পেরিয়ে সিলেটের দিকে চলে যায়। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে একাধিক সংঘর্ষে তাদের শক্তি কমে আসে, রসদ ফুরিয়ে যেতে থাকে, আর দলটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

এক পর্যায়ে সিলেট সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছালে সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির মেজর বাইংয়ের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে তাদের তীব্র সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধে মেজর বাইং নিহত হন এবং ব্রিটিশ বাহিনী পরাজিত হয়। এরপরও বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট লড়াই চলতে থাকে, তবে বিদ্রোহীদের পক্ষে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।

১৮৫৮ সালের ৯ জানুয়ারি, সিলেটের মনিপুর এলাকায় আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষে বিদ্রোহীরা মুখোমুখি হয় ইংরেজ বাহিনীর। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর রজব আলী এবং তার সঙ্গীরা গহীন পার্বত্য জঙ্গলের দিকে সরে যান। এরপর তারা আর সংগঠিতভাবে ফিরে আসেননি।

শেষ অধ্যায়ে করিমগঞ্জের মালগ্রাম, কাছাড়, হাইলাকান্দি হয়ে সাবাশপুর এলাকায় মোহনপুর চা বাগানের কাছে বিদ্রোহীদের আবার অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু স্থানীয় জমিদারদের চরদের মাধ্যমে তাদের অবস্থান ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে ফাঁস হয়ে যায়। লেফটেন্যান্ট রসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায়।

এই শেষ সংঘর্ষে বিদ্রোহীরা আবারও পরাজিত হয়। প্রায় ৭০ জন সিপাহি নিহত হন। আহত ও ক্ষুধার কারণে আরও অনেকে প্রাণ হারান। রজব আলী শেষ পর্যন্ত মাত্র কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে বেঁচে থাকেন।

এরপর শুরু হয় তাদের শেষ আশ্রয়ের পথচলা—দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল। ব্রিটিশ বাহিনী ধারাবাহিকভাবে খোঁজ চালালেও তাদের আর সঠিকভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যায় সেই দল, আর ইতিহাসের নীরব পাতায় থেকে যায় একটি অসমাপ্ত অধ্যায়—হাবিলদার রজব আলী ও ১৮৫৭ সালের চট্টগ্রাম বিদ্রোহের এক অনিশ্চিত সমাপ্তি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা